আহলে সুন্নাত ও মুতাযিলা
মুতাজিলাদের আহলে সুন্নাত থেকে খারিজ করে দেয়ার বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক
কার কথা মেনে মুতাজিলাদের আপনি আহলে সুন্নাত থেকে বের করে দিচ্ছেন? বের করে দেয়ার যুক্তিটাই-বা কী? তারা আল্লাহর কালামকে মাখলুক বলেছে? আল্লাহর যেই কালামকে তারা সিফাত হিসেবে মানতে অস্বীকার করেছে, সেটা আশআরী ও মাতুরীদীরাও তো করেছে। ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী তার 'আল আরবাইন' ও ইবনুল জাওযী তার 'আল মুনতাযাম' এ কী লিখেছেন পড়ে দেখুন।
ইবনুল জাওযী বলেন,
والمعتزلة قالوا هُوَ مخلوق، فوافق الأشعري المعتزلة في أن هذا مخلوق، وقال: ليس هذا كلام الله
"মুতাজিলারা একে (কোরআনের শব্দগুলো) মাখলুক বলেছে। আশআরী মুতাজিলাদের সাথে একমত হয়েছে যে, এটা আল্লাহর কালাম না, বরং মাখলুক।"
রাযী বলেন,
كونه تعالى متكلما بالمعنى الّذي يقوله «المعتزلة» مما نقول به ونعترف به ولا ننكره بوجه من الوجوه
"মুতাজিলারা আল্লাহকে যে অর্থে মুতাকাল্লিম বলে স্বীকার করে থাকে, আমরাও সেই অর্থেই বলে থাকি ও স্বীকার করি। তাদের কথায় আমাদের কোনদিক থেকেই আপত্তি নেই।"
মুতাজিলাদের তাকদীর সম্পর্কে বক্তব্য প্রবলেমেটিক? শায়খুল ইসলাম মুস্তাফা সাবরী তার মাওকিফে আকল ওয়াল ইলম বইয়ে সাফ লিখেছেন যে, মুতাজিলিদের তাকদীর বিষয়ক আকীদা হুবহু মাতুরীদীদের আকীদা –
إنَّ مذهب المعتزلة القدريَّة الذي انقرضَ رجاله ما زال يعيشُ في هذه المسألة تحتَ اسم الماتُريديَّة
"কাদারিয়া মুতাজিলাদের মাযহাবের অনুসারীরা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তাদের তাকদীর বিষয়ের আকিদা আজও মাতুরীদী নামের ছায়াতলে বেঁচে আছে।"
আচ্ছা, তাদের উপসংহার বাদ দিলাম। মেথডোলোজি নিয়ে সমস্যা? তারা আকলকে প্রাধান্য দেয় যেকোন দলীলের উপর। এটা সমস্যা? এটা তো আশআরীদেরও কথা! ইমাম রাজী তো লিখেছেনই –
والقول بترجيح النقل على العقل محال لأن العقل أصل النقل فلو كذبنا العقل لكنا كذبنا أصل النقل ومتى كذبنا أصل النقل فقد كذبنا النقل فتصحيح النقل بتكذيب العقل يستلزم تكذيب النقل
"আকলের উপর নকলকে প্রাধান্য দেয়া একটা অসম্ভব কথা। কারণ নকলের মূল হল আকল। যদি আমরা আকলকে মিথ্যাবাদী বলি, তবে নকলের গোড়াতেই আঘাত করা হবে। আর নকলের মূলোৎপাটন করা হলে খোদ নকলকেই মিথ্যা আখ্যা দেয়া হবে। সুতরাং আকলকে ভ্রান্ত সাব্যস্ত করে নকলকে বিশুদ্ধ আখ্যা দেয়া হলে আদতে নকলকেই ভ্রান্ত সাব্যস্ত করা হয়।"
মুতাজিলাদের মৌলিক দাবি এই মূলনীতি থেকে একটুও ভিন্ন না। মুতাজিলারা সুন্নত ও ইজমা অস্বীকার করে না। তারা সাহাবীদের অনুসরণ অস্বীকার করে না।
প্রসিদ্ধ মুতাজিলি ইমাম কাযী আব্দুল জাব্বার আশ শাফেয়ী তার ফাদলুল ইতিযাল গ্রন্থে বলেছেন:
ثبت بالتواتر والإجماع يجب أن يقال به وما عداه يجب أن يجوز إذا لم يمنع الدليل
"মুতাওয়াতির কিংবা ইজমার মাধ্যমে যা প্রমাণিত হবে তা স্বীকার করা কর্তব্য। কিন্তু এর বাইরে যেসব বর্ণনা আছে সেগুলোর বিরূদ্ধে যদি কোন দলিল না থাকে তবে একে সঠিক হওয়া সম্ভব বলা কর্তব্য।"
واعلم أن كثيرا من يشنعون مثل ذلك لا يعرف حقيقة السنة والجماعة فكيف يجوز أن يحتج بكلامه ومعنى سنة إذا أضيفت اليه صلى الله عليه هو ما أمر أن يدام عليه او فعله ليدام الاقتداء به فما هذا حاله يعد سنة الرسول وإنما يقع هذا الاسم على ما ثبت أنه قاله أو فعله وأما ما ينقل من أخبار الآحاد فإن صح فيه شروط القبول يقال فيه إنه سنة على وجه التعارف لأن إذا لم نعلم ذلك القول أو ذلك الفعل فالقول بأنه سنة يقبح لأن لا نأمن أن نكون كاذبين في ذلك وعلى هذا الوجه لا يجوز في العقل أن يقول في خبر الواحد قال رسول الله قطعا وإنما يجوز أن يقال روي عنه صلى الله عليه ذلك وأما الجماعه فالمراد به ما أجمع عليه الأمة وثبت ذلك من إجماعها فأما ما لم ما لم يثبت لم يجز التمسك به فهو بمنزلة أخبار الآحاد وإذا صح ما ذكرناه في الجملة فالمتمسك بالسنة والجماعة هم أصحابنا
"জেনে নাও এসকল বিষয় যারা নিন্দা করে থাকে তাদের অধিকাংশেরই সুন্নত এবং জামাতের বাস্তবতা সম্পর্কে অবগতি নেই, তাহলে কিভাবে তাদের কথাকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়? সুন্নত শব্দটি যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে সম্পৃক্ত করে বলা হয় তখন এর অর্থ হচ্ছে এমন কোন কাজের আদেশ যা তিনি সর্বাবস্থায় করতে বলেছেন কিংবা তার এমন কোন কাজ যা সর্বাবস্থায় অনুসরণ করা হউক এমন তিনি চেয়েছেন। কোন বিষয়ের অবস্থায় যদি এমনই হয় তখনই কেবল তাকে রাসুলের সুন্নত বলা যেতে পারে। আর এই শব্দটি সে বিষয়ের ব্যাপারেই প্রযোজ্য যা তিনি বলেছেন কিংবা করেছেন বলে প্রমাণিত। খবরে ওয়াহেদ যেসকল হাদীস বর্ণনা করা হয়, যদি সেসবের ক্ষেত্রে কবুল করার শর্তগুলো পরিপূর্ণ হয়, তবে একে প্রচলিত ভাষায় সুন্নত বলা যেতে পারে। কিন্তু যদি আমরা কোন কাজ কিংবা কোনো কথার ব্যাপারে এই বিষয়টা জানতে না পারি, তবে একে সুন্নত আখ্যা দেওয়া মন্দ বিষয়। কেননা আমরা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছি না যে, আমরা এসব ক্ষেত্রে রাসূলের নামে মিথ্যা কথা বলে ফেলছি কিনা। আর এ যুক্তিতেই আকলিভাবে খবরে ওয়াহেদকে আমাদের জন্য অকাট্যভাবে "রাসূল সা: বলেছেন” শব্দ ব্যবহার করে উল্লেখ করা অসম্ভব। বরং বলা উচিত হচ্ছে, “রাসূল থেকে বর্ণিত আছে।” আর জামাতের ব্যাপারে কথা হচ্ছে, জামাত হল এমন বিষয় যার ব্যাপারে উম্মতের ইজমা হয়েছে। কিন্তু যে বিষয়ে ইজমা প্রমাণিত নয়, সেগুলো খবরে ওয়াহিদের মতই। আর তাই একে আঁকড়ে থাকা উচিত নয়। আমরা এতক্ষণ সার্বিকভাবে যা বললাম তা যদি সঠিক হয়, তবে সুন্নত ও জামাতকে আঁকড়ে থাকা দল আমরাই।" (সমাপ্ত)
শুরুতে দাবি করেছিলাম মুতাজিলাদের আহলে সুন্নাত থেকে বহিস্কার করার বিষয়টি রাজনৈতিক। কারণ মুতাজিলারা সাহাবীদের সম্মান করে, এমনকি তাদেরকেও মুতাজিলা বলে। সুন্নত ও ইজমাকে হুজ্জত মানে। আকিদার বিষয়ে তারা খবরে ওয়াহেদ গ্রহণ করে না। ফিকহে তারা আবু হানিফা ও শাফেয়ীর মুকাল্লিদ। এমনকি হানাফি মাযহাবের সর্বপ্রথম উসুলের বইটি লিখেছেন একজন মুতাজিলি – ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসানের (আবু হানিফার ছাত্র) হাতে গড়ে ওঠা ছাত্র ঈসা বিন আবান। আশআরী ও মাতুরীদীদের সাথে তাদের উসুলের মোটাদাগে কোন পার্থক্য নেই। তারা খলকে আফআলুল ইবাদ অস্বীকার করে না। ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়। হ্যাঁ, সালাহ ও আসলাহ, শাফায়াত, তওবা না করে মারা গেলে চিরদিন দোজখে থাকবে ইত্যাদি বিষয়ে তাদের কথা বিতর্কিত ও ক্ষেত্র বিশেষে আপত্তিকর। কিন্তু এক-দুইটি আপত্তিকর কথা পেলেই, পুরোপুরি ডিসমিস করে দিতে হবে, এটা কেমন কথা?
ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন,
وعبد الرحمن الأصم وإن كان معتزليًّا فإنه من فضلاء الناس وعلمائهم، وله تفسير، ومن تلاميذه إبراهيم بن إسماعيل بن علية، ولإبراهيم مناظرات في الفقه وأصوله مع الشافعي وغيره، وفي الجملة فهؤلاء من أذكياء الناس وأحدهم أذهانا، وإذا ضلوا في مسألة لم يلزم أن يضلوا في الأمور الظاهرة التي لا تخفى على الصبيان وهذا كما أن الأطباء وأهل الهندسة من أذكياء الناس ولهم علوم صحيحة طبية وحسابية وإن كان ضل منهم طوائف في الأمور الإلهية فذلك لا يستلزم أن يضلوا في الأمور الواضحة في الطب والحساب فمن حكى عن مثل أرسطو أو جالينوس أو غيرهما قولا في الطبيعيات ظاهر البطلان علم أنه غلط في النقل عليه وإن لم يكن تعمد الكذب عليه
"আব্দুর রহমান আল আসাম মুতাজিলি হলেও শ্রেষ্ঠ মনীষী ও আলেমদের একজন। তার তাফসীর গ্রন্থ আছে। তার ছাত্রদের একজন হচ্ছে ইব্রাহিম বিন ইসমাইল বিন উলাইয়া। ইব্রাহিমের সাথে ইমাম শাফেয়ীর ফিকহ ও উসুল নিয়ে বিতর্ক হত। মোদ্দাকথা হল - এই মুতাজিলিরা মেধাবী ও ক্ষুরধার মস্তিষ্কের মানুষদের মধ্যে অন্যতম। তারা যদি কোন একটি মাসআলাতে পথভ্রষ্ট হয়ে থাকে, এতে আবশ্যক হয়ে যায় না যে, সুস্পষ্ট ও শিশুসুলভ বিষয়গুলোতেও তারা পথভ্রষ্ট হবে। যেভাবে চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা মেধাবী মানুষের অন্যতম। চিকিৎসা ও প্রকৌশল বিষয়ে তাদের জ্ঞান বিশুদ্ধ, যদিও ইলাহিয়্যাত (স্রষ্টাতত্ত্ব) কিছু বিষয়ে তাদের অনেকে ভ্রষ্ট হয়েছে। কিন্তু তাই বলে চিকিৎসা কিংবা প্রকৌশলের স্পষ্ট বিষয়গুলোতে তাদের ভ্রষ্ট হওয়া আবশ্যক হয় না। সুতরাং কেউ যদি এরিস্টটল, গ্যালেনাস প্রমুখ থেকে ভৌতবিজ্ঞান বিষয়ে এমন কোন বক্তব্য উদ্ধৃত করে যার বিভ্রান্তি সুস্পষ্ট, তবে বুঝতে হবে যে, উদ্ধৃতি সঠিক নয়। উদ্ধৃতিকারী হয়ত মিথ্যা বলার উদ্দেশ্যে এটা বলে নি, হয়ত তার ভুল হয়ে গেছে এটা উল্লেখ করতে।" (মিনহাজুস সুন্নাহ)
মূলত মুতাজিলাদের আগাগোড়া ডিসমিস করে দেয়ার চল শুরু হয়েছিল ইমাম আহমদের সময় থেকে। মুতাজিলাদের এক অংশই প্রথম বাড়াবাড়ি শুরু করেছিল। ইমাম আহমদ ও আহলে হাদীসদের বিদআতি আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নির্যাতন করে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইমাম আহমদ ও তার সমর্থকরা মুতাজিলাদের সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেন। তাদের বিদআতি ও পথভ্রষ্ট আখ্যা দেন। মুতাজিলারা দ্রুতই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণ হারিয়ে ফেলে এবং তাদের জায়গায় অব্বাসিরা হাম্বলীদের পৃষ্ঠপোষণ শুরু করে এবং ইমাম আহমদের আকিদাকে অফিসিয়াল আকিদা হিসেবে ফরমান জারি করে। কিন্তু সময় থেমে থাকে নি। মুতাজিলাদের পরিণতি হাম্বলীদেরও বরণ করতে হয়েছে। আশআরীরা আহলে সুন্নত বলে স্বীকৃতি পেত না যদি তাদের মদদ করার জন্য সেলযুক, আইয়ুবী ও মামলুক সুলতানরা না থাকত। আর একারণেই বাগদাদে ক্ষয়িষ্ণু আব্বাসীদের অনুগত হাম্বলী ও সেলযুকদের অনুগত আশআরীদের মাঝে কারা আহলে সুন্নত এই নিয়ে রক্তক্ষয়ী মারামারি হয়েছিল, যা আমাদের ইতিহাসে কুশাইরির ফিতনা নামে কুখ্যাত। বেচারা মুতাজিলাদের কপাল খারাপ, ইমাম আহমদের বদদোয়াতেই কিনা আল্লাহ জানেন, কিন্তু তারপর থেকে রাজনৈতিক কোন পৃষ্ঠপোষক না পেয়ে তারা সুন্নিদের সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সচেতন সবাই জানেন ইমাম আহমদ কেবল মুতাজিলা নয়, ইমাম আবু হানিফার অনুসারীদেরকেও বাতিল গোমরাহ বলে ডিসমিস করে দিয়েছিলেন! তিনি যেসব কথা বলেছেন সেগুলো হাম্বলী আলেমদের নির্ভরযোগ্য জীবনীগ্রন্থ, ইবনে আবি ইয়ালার 'তাবাকাতে হানাবিলা'তে পাবেন।
ইমাম আহমদ শিয়া, খারেজি, কাদারিয়াদের নিন্দা ও তিরস্কার করার পর হানাফিদের প্রসঙ্গে বলেন:
وأصحاب الرأي وهم مبتدعة ضلال أعداء للسنة والأثر يبطلون الحديث ويردون على الرسول ويتخذون أبا حنيفة ومن قال بقوله إماما ويدينون بدينهم وأي ضلالة أبين ممن قال بهذا وترك قول الرسول وأصحابه واتبع قول أبي حنيفة وأصحابه فكفى بهذا غيا مرديا وطغيانا.
"আসহাবে রায় হল বিদআতি, গোমরাহ, রাসূলের সুন্নত ও সাহাবীদের আছারের শত্রু। তারা হাদীসকে বাতিল করে দেয়, রাসূলের সুন্নতকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবু হানিফা ও তার মতাবলম্বীদের ইমাম হিসেবে গ্রহণ করে। এর চাইতে সুস্পষ্ট গোমরাহী আর কী হতে পারে যারা রাসুল ও তার সাহাবীদের বক্তব্য বর্জন করে আবু হানীফা ও তার ছাত্র ও সঙ্গীদের মতকে অনুসরণ করে? বিভ্রান্তি, ধ্বংস ও বিদ্রোহের জন্য এটাই তো যথেষ্ট!"
কখনো ভেবেছেন যে হানাফীদের ব্যাপার ইমাম আহমদের নিন্দা ও আপত্তি কেন ধোপে টিকলো না? কারণ আফ্রিকা মহাদেশ ও হাম্বলীদের আস্তানা বাগদাদ বাদ দিলে, গোটা মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ অঞ্চল হানাফী মাযহাবের অনুসারী শাসক ও সুলতানদের দ্বারা পরিচালিত হত। মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর তো হাম্বলীরা এক প্রকার ভিটেমাটিহীন হয়ে পড়ে। এই যে বর্তমানে চার মাযহাবের ঐক্য ও সংহতির কথা বলা হয়, সেটা ইমাম আহমদের যুগে ছিল না। থাকলে তিনি হানাফীদের এত কর্কশ ভাষায় নিন্দা ও তিরস্কার করতেন না। এই ঐক্য ও সংহতি তৈরি হয়েছে শিয়াদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার তাকিদ থেকে এবং এমন এক সময়ে যখন মুতাজিলারা বিলুপ্ত হবার পথে। তাছাড়া এখনো যে এই বিতর্ক হারিয়ে গেছে এমন না। কট্টর আশআরী ও মাতুরীদীরা এখনো ইমাম আহমদের আকীদাকে (যা ইবনুল জাওযী কিংবা ইবনে কুদামা-রা পর্যন্ত উল্লেখ করে গিয়েছেন, ইবনে তাইমিয়্যাহ বাদ দিন!) গোমরাহী আকীদা বলে, যেমন: সাইদ ফুদা ও তার অনুসারীরা।
পরিশেষে আমার বক্তব্য হচ্ছে, রাসূল তার উম্মতকে সুন্নি ও বিদআতি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেন নি। কোরআনও মুসলিমদের মাঝে এই বিভাজনের কথা বলে নি। বরং মুসলিমদের মাঝে বিভাজন হবে আমল দিয়ে। যারা ভাল তারা সালেহীন, যারা খারাপ তারা ফাসেকীন। বিদআত বিষয়টা গোটা ইতিহাস জুড়ে অদ্যবধি সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মুসলিমদের মাঝে একাডেমিক বিতর্ক হতে পারে। কারো কোন বক্তব্যকে আপনি বিভ্রান্তিপূর্ণ ও পরিত্যাজ্য আখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু বিদআতি বলে সামাজিকভাবে একঘরে করে দেয়া কোন একাডেমিক ও স্কলারলি কাজ নয়। একাডেমিক বিষয়কে একাডেমিক জায়গাতে রাখতে হবে।
যারা খিলাফতের স্বপ্ন দেখেন, তাদের উচিত এই বিদআতের ইস্যুটাতে তাজদীদ আনার ব্যবস্থা করা। অন্যথায় আপনি কাকে খলিফা বানাবেন? দেওবন্দিকে বানালে বেরেলবী মেনে নিবে? হাম্বলীকে বানালে আশআরী মেনে নিবে? এই বিদআত নামক ধারালো অস্ত্রটা উম্মাতকে যেই পরিমাণ টুকরো টুকরো করেছে, তার তুলনা আর কিছুতেই নেই। মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব ও তার নজদি প্রজেক্ট দেখেও যদি আমরা এখনো এই সবকটা শিখতে না পারি, কেয়ামত পর্যন্ত আর শেখা হবে না। আর অযোগ্য কাউকে আল্লাহ কর্তৃত্ব দেন না।
ولقد كتبنا في الزبور من بعد الذكر أن الأرض يرثها عبادي الصالحون
"আমরা যাবুরগ্রন্থে উপদেশবাণী উল্লেখ করার পর লিখে দিয়েছিলাম যে, এই ভূখণ্ডের উত্তরাধিকারী হবে আমার সালেহ (সালাহিয়াত বা যোগ্যতা ধারী : তাফসীর আল মানার) বান্দারা।"
শেষের আগে ইমাম যাহাবীর একটি বক্তব্য উল্লেখ করি যাকে আমরা মূলনীতি হিসেবে নিতে পারি। তিনি লিখেছেন :
غُلاَةُ المُعْتَزِلَةِ، وغُلاَة الشِّيعَة، وغُلاَة الحَنابِلَة، وغُلاَة الأشاعِرَةِ، وغلاَة المُرْجِئَة، وغُلاَة الجَهْمِيَّة، وغُلاَة الكَرّامِيَّة، قَدْ ماجت بِهِم الدُّنْيا، وكثرُوا، وفِيهِم أذكياءُ وعُبّاد وعُلَماء، نَسْألُ اللهَ العفوَ والمَغْفِرَة لأهْل التَّوحيد، ونبرَأُ إلى اللهِ مِنَ الهَوى والبِدَع، ونُحبُّ السُّنَّةَ وأهْلَها، ونُحِبُّ العالِمَ عَلى ما فِيهِ مِنَ الاتِّباعِ والصِّفاتِ الحمِيدَة، ولاَ نُحبُّ ما ابْتدعَ فِيهِ بتَأْوِيلٍ سائِغٍ، وإنَّما العبرة بكثرة المحاسن.
"কট্টর মুতাজিলা, কট্টর শিয়া, কট্টর হাম্বলী, কট্টর আশআরী, কট্টর মুরজিয়া, কট্টর জাহমিয়া, কট্টর কাররামিয়াদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে দুনিয়াটা ভরে গিয়েছে। এই কট্টর লোকগুলোর মাঝে অনেক মেধাবী আছে, জ্ঞানী আছে, এবাদতগুজার আছে। আল্লাহর কাছে সকল তাওহীদে বিশ্বাসীর জন্য ক্ষমা ও মাগফিরাত চাই। আল্লাহর কাছে খায়েশাত ও বিদআত থেকে দায়মুক্তির অঙ্গীকার করি। সুন্নত ও এর অনুসারীদের ভালবাসি। একজন আলেমকে তার মাঝে যতটুকু অনুসরণ ও প্রশংসনীয় গুণাবলী আছে সেই অনুপাতে ভালবাসি। সম্ভাবনাময় তাবিল করার মাধ্যমে যে বিদআত তৈরি হয় সেটা ভালবাসি না। বরং কোন ব্যাক্তিকে আমরা মাপি তার প্রশংসনীয় বিষয়ের আধিক্য অনুযায়ী।"
প্রাসঙ্গিক লেখা : কোরআন-সুন্নাহতে কি আহলুস সুন্নাত এবং আহলুল বিদআত বলে মুসলিমদের দুই ভাগ করা প্রমাণিত?

