আহলুস সুন্নাত ও আহলুল বিদআতের বিভাজন
কোরআন-সুন্নাহতে কি আহলুস সুন্নাত এবং আহলুল বিদআত বলে মুসলিমদের দুই ভাগ করা প্রমাণিত?
বিদআত বিদআত করে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থসিদ্ধির পায়তারা করা লোকদের কর্মকাণ্ডের আয়রনি দেখে মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড বিনোদন মিশ্রিত বেদনা দলা পাকিয়ে ওঠে। আমাদের আহলে হাদিস ভাইরা এই কর্মকাণ্ড খুব নিষ্ঠা এবং নিষ্ঠুরতার সাথে করে থাকেন। একদিকে সহিহ হাদিস পালনের নামে প্রতিষ্ঠিত ফিকহি মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন, উম্মাতের শ্রেষ্ঠ ফকিহ আবু হানিফার অবমাননা করে বেড়ায় এই বিদআতপক্ষীরা, অন্যদিকে নিজেদের উগ্র কর্মপদ্ধতিকে জাস্টিফাই করে সুস্পষ্ট জাল ও বানোয়াট হাদিস দিয়ে। এমনই এক হাদিস নিয়ে আজকের আলোচনা।
কোরআনে পাকের আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,
يوم تبيض وجوه وتسود وجوه فأما الذين اسودت وجوههم
“যেদিন অনেক চেহারা অন্ধকার হয়ে যাবে, আর অনেক চেহারা হবে আলোকোজ্জ্বল … “ (সুরা আলে ইমরান ১০৬)
আয়াতের এই অংশের তাফসিরে তারা ইবনে উমার, ইবনে আব্বাস ও আবু সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণনা উল্লেখ করে যে, তারা বলেছেন,
تبيض وجوه أهل السنة والجماعة، وتسود وجوه أهل البدع
“যাদের চেহারা আলোকোজ্জ্বল হবে তারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাত, আর যাদের চেহারা অন্ধকার হবে তারা আহলুল বিদআত।”
মূলত এই প্রত্যেকটা বর্ণনা কাট্টা জাল হাদিস। কীভাবে? বলছি …
গতকাল আমার পোস্টে লিখেছিলাম যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মুসলিমদের একটিমাত্র সমাজ থাকার কথা বলেছেন। সেই সমাজে কেউ কেউ হবে সালেহ বা নেককার। কেউ কেউ হবে ফাসেক বা বদকার। কথা না আল্লাহ তা’আলা কোরআনে, না নবিয়ে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সুন্নাতে কারিমায় উম্মাতে মুসলিমাকে ‘আহলে সুন্নত’ এবং ‘আহলে বিদআত’ নামের ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছেন, আর না মুসলিমদের কোন দলকে ‘বিদআতি’ আখ্যা দিয়ে সামাজিকভাবে একঘরে করতে বলেছেন। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) যেখানে তার সম্মানে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের সুস্পষ্ট অবমাননা থাকা সত্তেও তাকে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, “মুহাম্মাদ তার সঙ্গীদের হত্যা করে এমন কেউ বলুক আমি চাই না”, সেখানে আজকে সুন্নাত ও জামাতের নাম নিয়ে উম্মাতের এক অংশ আরেক অংশকে সামাজিকভাবে বয়কট করা নিয়ম বানিয়ে নেয়া হয়েছে। অনেকে সালাফদের কতিপয় উক্তি ব্যবহার করে ‘বিদআতি’ মুসলিমদের সালাম দেয়া, তাদের দাওয়াতে অংশ নেয়া, জানাযায় শরিক হওয়াকে নিষিদ্ধ করে থাকে, আল্লাহর রাসুলের সুস্পষ্ট নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে,
حق المسلم على المسلم ستٌّ، قيل: ما هن يا رسول الله؟ قال: إذا لقيته فسلِّم عليه، وإذا دعاك فأجِبْه، وإذا استنصَحك فانصَح له، وإذا عطس فحمِد الله فشمِّته، وإذا مرِض فعُدْه، وإذا مات فاتَّبِعه
নবিয়ে করিম বলেন, এক মুসলিমের অন্য মুসলিমের ওপর ছয়টি অধিকার রাখে। জিজ্ঞেস করা হল: কী কী সেই অধিকার ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর রাসুল বললেন, (১) যখন তার সাথে সাক্ষাত হবে তাকে সালাম দিবে, (২) যখন তোমাকে সে দাওয়াত দিবে, দাওয়াত কবুল করবে, (৩) যদি তোমার কাছে পরামর্শ চায়, পরামর্শ দিবে, (৪) যদি হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে, তাকে এর জবাব দিবে, (৫) যদি সে অসুস্থ হয়, তাকে পরিচর্যা করতে যাবে, (৬) যদি সে মারা যায়, তার জানাযার পিছু নিবে।
আল্লাহর রাসুল বলেছেন,
قد تركتكم على البيضاء ليلها كنهارها لا يزيغ عنها بعدي إلا هالك
“তোমাদের আমি শুভ্র-সাদা পথে রেখে যাচ্ছি, যে পথে রাত্র দিনের মতই উজ্জ্বল। আমার পর এই পথ থেকে কেবল ধ্বংসপ্রাপ্তরাই বিচ্যুত হবে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
কী সেই শুভ্র পথ? সহিহ বুখারির হাদিসে আল্লাহর রাসুল বলেন,
من صلى صلاتنا واستقبل قبلتنا وأكل ذبيحتنا فذلك المسلم الذي له ذمة الله وذمة رسوله فلا تخفروا الله في ذمته
“যারা আমাদের নামায অনুযায়ী নামায পড়ে, আমাদের কিবলার দিকে মুখ ফেরায়, আমাদের জবাই করা পশুর মাংস খায়, জেনে নাও, সেই হচ্ছে মুসলিম। তার জন্য রয়েছে আল্লাহর যিম্মা (নিরাপত্তা), তাঁর রাসুলের যিম্মা। সাবধান, তোমরা আল্লাহর নিরাপত্তাকে নস্যাত করো না।”
আজ আমরা রাসুলের নির্দেশনাকে অবলীলায় বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেড়াচ্ছি। মুসলিমদের প্রথমে বিদআতি ডাকা দিয়ে শুরু করি, সামাজিকভাবে বয়কট করে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। এরপর কাফের আখ্যা দিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করি।
হ্যাঁ, আমি ইতিহাস অস্বীকার করি না। সালাফের যুগে বিদআতিদের ব্যাপারে প্রচণ্ড সামাজিক বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও সামাজিক মেলামেশায় বড় আলেমগণ নিন্দা জ্ঞাপন করেছিলেন। কিন্তু সেটারও সামাজিক ও রাজনৈতিক একটা কনটেক্সট ছিল। সালাফের যুগে খারেজি, রাফেযিদের সশস্ত্র উত্থান ঘটেছিল। কিছুদিন পরপর এই নতুন মতবাদের লোকেরা বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলা পরিচালনা করত। বহু সাধারণ মুসলিমকে হত্যা করত। এই উগ্রবাদীরা নিজেরাই মুসলিমদের জামাত থেকে বেরিয়ে গিয়ে সমাজের বিরুদ্ধে সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছিল। ফলে তাদের সাথে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রেখে সহাবস্থান করা সম্ভবপর ছিল না। আল্লাহর রাসুলের বিশুদ্ধ সুন্নাত, কোআনে ঐক্যের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশনা মাথায় রেখে বিবেচনা করলে সালাফের যুগে বিদআতিদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের জন্য এর চেয়ে ভাল কোন ব্যাখ্যা হয় না। কিন্তু সালাফের যুগ মানেই নিষ্কলুশ না। সালাফের যুগেই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদেরকে গোমরা ও পথভ্রষ্ট বলার ভুঁড়িভুঁড়ি নমুনা পাওয়া যায়। যেমন: ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ও তাদের অনুসারীদেরকে ইমাম আহমাদ গোমরাহ ও বিদআতি আখ্যা দিয়েছেন। এছাড়াও ইমামে আজম আবু হানিফাকে কাফের পর্যন্তও বলেছেন গণ্যমান্য সালাফরা, যা আব্দুল্লাহ বিন ইমাম আহমদ কিংবা খতিবে বাগদাদী বিশদ বিবরণ সহ উল্লেখ করেছেন। আমাদের এই কালো ইতিহাস সম্পর্কেও জানতে হবে। ইমাম ইবনে আব্দুল বার আল আন্দালুসি বলেছেন, মানুষের মাঝে আবু হানিফার খ্যাতি ও স্বীকৃতিতে ঈর্ষাকাতরতা থেকেই আবু হানিফার মৃত্যুর পর সালাফদের বড় একটা অংশ আবু হানিফার পিণ্ডি চটকাতে মশগুল হয়ে ওঠেন। আজকে আমাদের সালাফের নামে যেই রূপকথার ইতিহাস শোনানো হয় বাস্তবতা এর ধারেকাছেও নেই। ইমাম ইসহাক বিন রাহাওয়াইহ থেকে বর্ণিত আছে, যা ফাতহুল বারীতে ইবনে হাজার, উমদাতুল কারীতে বদরুদ্দীন আইনী ছাড়াও বহু মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, আমিরে মুয়াবিয়ার ব্যাপারে একটা ফযিলতও বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয় নি। ইবনুল কাইয়্যিমও এটা উল্লেখ করেছেন। অথচ সর্বস্বীকৃত এই বিষয়টি দামেশকের মসজিদে ঘোষণা করায় সুনানে নাসাঈর মহান লেখক ইমাম নাসাঈকে পদদলিত করা হয়, যাতে গুরুতর আহত হয়ে ইমাম নাসাঈ ইন্তেকাল করেন। হ্যাঁ, ভাইয়েরা। এই সব লজ্জাজনক বৃত্তান্ত সবই সালাফের যুগের।
মূল আলাপে ফিরে আসি। আমাদের আহলে হাদিস ব্রাদাররা ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমারের বরাতে (কেউ কেউ আবার আবু সাঈদ খুদরি থেকে সনদবিহীন ভিত্তিহীন মারফু রেওয়ায়াতও উল্লেখ করে) বলেন যে, আহলুস সুন্নাহ ও আহলুল বিদআত নামে মুসলিমদের দুইভাগ করার কথা কোরআনের আয়াত (আলে ইমরান ১০৬) দ্বারাই প্রমাণিত। সারাক্ষণ সহিহ সহিহ করে বেড়ানো এই লোকগুলোর কপটতার মুখোশ উন্মোচন করার সময় হয়েছে।
প্রথম হাদিস : ইবনে উমারের বর্ণনা।
হাদিসের মান : বানোয়াট ও পরিত্যাক্ত
এই বর্ণনাটি দায়লামি ‘ফিরদাউসুল আখবার’ গ্রন্থে, ইবনে আররাক ‘তানযিহুশ শারিয়াহ’ গ্রন্থে, ইমাম কুরতুবি তার তাফসির গ্রন্থে, জালালুদ্দিন সুয়ুতি ‘আদ দুররুল মানসুর’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। আলোচ্য আয়াতের তাফসির হাদিসটি উল্লেখ করার পর ইমাম কুরতুবি মন্তব্য করেন —
وَقَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ هَذَا رَوَاهُ مَالِكُ بْنُ سُلَيْمَانَ الْهَرَوِيُّ أَخُو غَسَّانَ عَنْ مَالِكِ بْنِ أَنَسٍ عَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى" يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ" قَالَ: (يَعْنِي تَبْيَضُّ وُجُوهُ أَهْلِ السُّنَّةِ وَتَسْوَدُّ وُجُوهُ أَهْلِ الْبِدْعَةِ) ذَكَرَهُ أَبُو بَكْرٍ أَحْمَدُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ ثَابِتٍ الْخَطِيبُ. وَقَالَ فِيهِ: مُنْكَرٌ مِنْ حَدِيثِ مَالِكٍ
“ইবনে আব্বাসের এই তাফসিরটি ইবনে উমার থেকেও মালিক বিন সুলাইমান হারাবি (গাসসানের ভাই) বর্ণনা করেছেন, ইমাম মালেক বিন আনাসের বরাতে নাফে’ থেকে ইবনে উমারের সুত্রে যে, আল্লাহর রাসুল এরশাদ করেছেন, “যেদিন অনেক চেহারা অন্ধকার হয়ে যাবে, আর অনেক চেহারা হবে আলোকোজ্জ্বল … “ আয়াতের অর্থ হচ্ছে আহলুস সুন্নাতের চেহারা আলোকোজ্জ্বল হবে, আর আহলুল বিদআতের চেহারা অন্ধকার হবে।” খতিবে বাগদাদি (আবু বকর আহমদ বিন আলি বিন সাবেত) এই হাদিস উল্লেখ করে বলেছেন, এটা মালেক থেকে বর্ণিত একটি মুনকার (পরিত্যাজ্য) হাদিস।”
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি তার ‘লিসানুল মিযান’ কিতাবে এই হাদিস সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছেন,
قال الدارقطني حدثني أبو الحسن محمد بن عبد الله المزني الهروي ثنا أبو نصر أحمد بن عبد الله الأنصاري ثنا الفضل بن عبد الله بن مسعود اليشكري ثنا مالك بن سليمان الهروي ثنا مالك عن نافع عن ابن عمر رضى الله تعالى عنهما رفعه في قوله تعالى: {يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ} فأما الذين ابيضت وجوههم أهل السنة والجماعة وأما الذين اسودت وجوههم أهل الأهواء والبدع قال هذا موضوع والحمل فيه على أبي نصر الأنصاري والفضل ضعيف وأخرجه الخطيب في الرواة عن مالك من طريق أبي زرعة حدثنا أحمد بن الحسين الحافظ ثنا أبو نصر أحمد بن محمد بن عبد الله القيسي بهراة ثنا الفضل به وقال منكر من حديث مالك ولا أعلمه يروي إلا من هذا الوجه
“দারাকুতনি স্বীয় সনদে মালেক বিন সুলায়মান আল হারাবির সুত্রে ইমাম মালেক থেকে নাফে’, অতঃপর ইবনে উমার থেকে মারফু সুত্রে যে, “যেদিন অনেক চেহারা অন্ধকার হয়ে যাবে, আর অনেক চেহারা হবে আলোকোজ্জ্বল…” এর ব্যাখ্যা হচ্ছে: যাদের চেহারা আলোকোজ্জ্বল হবে তারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাত, আর যাদের চেহারা অন্ধকার হবে তারা আহলুল হাওয়া ওয়াল বিদআত।” দারাকুতনি বলেছেন এটা মাওদু অর্থাৎ বানোয়াট হাদিস। মূলত এটি আবু নাসর আল আনসারির কাজ। এছাড়াও সনদে থাকা ফাদ্বল দূর্বল রাবী। দারাকুতনি ছাড়াও এই বর্ণনাটি খতিবে বাগদাদি ইমাম মালেক থেকে বর্ণনাকারীদের সংকলন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন আবু যুরআর সুত্রে। অতঃপর বলেছেন, এটা ইমাম মালেকের নামে বর্ণিত মুনকার (পরিত্যাক্ত) হাদিস। আর কেউ এটি তার থেকে এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন বলে আমরা জানি না।”
দ্বিতীয় হাদিস : ইবনে উমারের বর্ণনা।
হাদিসের মান : বানোয়াট।
জর্ডানের বিখ্যাত মুহাদ্দিস মাশহুর হাসান ‘ই’লামুল মুওয়াক্কিইন’ গ্রন্থের পাদটীকায় এই হাদিস সম্পর্কে মন্তব্য করেন:
أخرجه اللالكائي في "شرح السنة" (1/ 72 رقم 74) من طريق أحمد بن محمد بن مسروق الطوسي، والسهمي في "تاريخ جرجان" (ص 132 - 133) من طريق إسماعيل بن صالح الحلواني، والخطيب (7/ 379)، والآجري في "الشريعة" (3/ 589 - 590 رقم 2128 - ط وليد سيف)، من طريق أبي عمر الدوري، كلهم قالوا: حدثنا علي بن قدامة عن مجاشع بن عمرو عن ميسرة بن عبد ربه عن عبد الكريم به، وألفاظهم قريبة من بعضها.
وأخرجه ابن أبي حاتم في "التفسير" (2/ 464 رقم 339 - آل عمران) من طريق مجاشع به.
قلت: وإسناده ضعيف جدًا، إن لم يكن موضوعًا؛ ففيه علي بن قدامة ضعيف، وشيخه مجاشع بن عمرو اتهم بالكذب، وشيخه ميسرة مثله.
ثم إن المتأمل في هذا التفسير يجد فيه نكارة، وهي أنه مخالف لنص القرآن الكريم، فقد بيّن اللَّه تعالى لنا من هم الذين تبيض وجوههم، ومن الذين تسود وجوههم فقال: {يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ (106) وَأَمَّا الَّذِينَ ابْيَضَّتْ وُجُوهُهُمْ فَفِي رَحْمَةِ اللَّهِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} [آل عمران: 106] واللَّه أعلم
"লালকায়ি এটি ‘শারহুস সুন্নাহ’ গ্রন্থে আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন মাসরুক তুসীর সুত্রে, সাহমী একে ‘তারিখু জুরজান’ গ্রন্থে ইসমাইল বিন সালেহ হালওয়ানি সুত্রে, খতিবে বাগদাদি ও ‘আশ শারিয়াহ’ কিতাবে আজুররি এটি বর্ণনা করেছেন আবু উমার দাওরির সুত্রে।
তাদের প্রত্যেকেই এই হাদিস বর্ণনা করেছে আলি বিন কুদামা থেকে, তিনি মাজাশি’ বিন আমর থেকে, তিনি মাইসারা বিন আব্দে রব্বিহি থেকে, তিনি আব্দুল কারিম। প্রত্যেকের উল্লিখিত বর্ণনার শব্দ কাছাকাছি ও প্রায় একই রকম।
এছাড়াও ইবনে আবি হাতেম তার তাফসিরে এটি মাজাশি’ থেকে বর্ণনা করেছেন।
আমার (মাশহুর হাসান) মতে, হাদিসটি যদি বানোয়াট জাল হাদিস নাও হয়, তবুও প্রচণ্ড দূর্বল হাদিস। কেননা এর সনদে আছে আলি বিন কুদামার ন্যায় দূর্বল রাবী, মাজাশি’ বিন আমর ও তার শায়খ মায়সারা - যারা দুইজনই মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত।
এছাড়াও এই তাফসির নিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, এটি আপত্তিকর। কারণ এটি খোদ কোরআনের আয়াতের সাথেই সাংঘর্ষিক, কারণ সম্পূর্ণ আয়াতটি হচ্ছে -
يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ وَأَمَّا الَّذِينَ ابْيَضَّتْ وُجُوهُهُمْ فَفِي رَحْمَةِ اللَّهِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
“যেদিন অনেক চেহারা অন্ধকার হয়ে যাবে, আর অনেক চেহারা হবে আলোকোজ্জ্বল। যাদের চেহারা অন্ধকার হবে তাদের বলা হবে, তোমরা কী ঈমান আনার পর কুফরি করেছ? শাস্তি আস্বাদান কর তোমাদের কুফরির কারণে। আর যাদের চেহারা আলোকোজ্জ্বল হবে, তারা থাকবে আল্লাহর রহমতে, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে “ ওয়াল্লাহু আ’লাম।"০ (সমাপ্ত)
তৃতীয় হাদিস : আবু সাঈদ খুদরী থেকে একটি অজ্ঞাত বর্ণনা যা জালালুদ্দিন সুয়ুতি বিনা সনদে আদ দুররুল মানসুরে উল্লেখ করেছেন। সনদবিহীন একটা বর্ণনা নিয়ে আলোচনা করার প্রশ্নই আসে না।
ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়াতটাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। এমনকি ইবনে কাসির তার তাফসিরেও এটি সনদের আলোচনা ব্যতিরেকে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সনদ নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায় যে, এই বর্ণনাটি ব্যবহার করার কোন সুযোগ নেই।
এই বর্ণনার কেন্দ্রীয় দুই রাবী হচ্ছে — মাজাশি’ ও মায়সারা। আসুন তাদের সাথে পরিচিত হই।
(ক) মাজাশি’ বিন মায়সারা
أبو أحمد الحاكم : منكر الحديث
আবু আহমদ হাকেম বলেন, সে মুনকারুল হাদিস (তার হাদিস পরিত্যাজ্য)
أبو جعفر العقيلي : حديثه منكر غير محفوظ
আবু জাফর উকায়লী বলেন, তার হাদিস মুনকার ও অসংরক্ষিত।
أبو حاتم الرازي : متروك الحديث ضعيف ليس بشيء
আবু হাতেম রাযী বলেন, তার হাদিস বর্জনীয়। সে দূর্বল, কিছুই না।
أبو حاتم بن حبان البستي : كان ممن يضع الحديث على الثقات، ويروي الموضوعات عن أقوام ثقات، لا يحل ذكره في الكتب إلا على سبيل القدح فيه، ولا الرواية عنه إلا على سبيل الاعتبار للخواص
আবু হাতেম বিন হিব্বান বলেন, সে নির্ভরযোগ্য ব্যাক্তিদের নামে হাদিস জাল করত। নির্ভরযোগ্য ব্যাক্তিদের নামে বানোয়াট কথা বর্ণনা করত। কোন বইতে তাকে উল্লেখ করা বৈধ না। হ্যাঁ, যদি তার সমালোচনা ও নিন্দা করতে হয় তাহলে ভিন্ন কথা। তার বর্ণনাগুলো কেবলমাতর বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের সামনে পর্যালোচনার জন্য উল্লেখ করা বৈধ।
أبو نعيم الأصبهاني : لا يعتمد على روايته ومفاريده
আবু নুয়াইম আল ইসফাহানি বলেন, তার রেওয়ায়েত ও একক বর্ণনাগুলোর উপর নির্ভর করা যাবে না।
الذهبي : ذكر له حديثا فى تلخيصه وقال: ذا من وضعه
ইমাম যাহাবি তালখিস কিতাবে তার একটি হাদিস উল্লেখ করে বলেন, এটা তার বানানো হাদিসগুলোর একটা।
محمد بن إسماعيل البخاري : منكر مجهول
ইমাম বুখারি বলেন, সে পরিত্যাক্ত ও অজ্ঞাত।
يحيى بن معين : أحد الكذابين
ইয়াহিয়া বিন মাঈন বলেন, মিথ্যুকদের একজন।
(খ) মায়সারা বিন আব্দে রব্বিহি
أبو أحمد بن عدي الجرجاني : ضعيف، ويخلط في الأحاديث، وعامة حديثه يشبه بعضها بعضا في الضعف
ইবনে আদী আল জুরজানী বলেন, দূর্বল, সে তার হাদিসগুলো গুলিয়ে ফেলত। তার বর্ণিত অধিকাংশ হাদিসই দূর্বলতার দিক থেকে একে অন্যের সাদৃশ্যপূর্ণ।
أبو بشر الدولابي : كان كذابا
আবু বিশর আদ দুলাবী বলেন, সে একজন কাজ্জাব (মিথ্যুক)
أبو جعفر العقيلي : أحاديثه بواطيل غير محفوظة
ইমাম উকায়লী বলেন, তার হাদিসগুলো বাতিল ও অসংরক্ষিত।
أبو حاتم الرازي : كان يرمى بالكذب وكان يفتعل الحديث
আবু হাতেম রাযী বলেন, তার ব্যাপারে মিথ্যা বলার অভিযোগ আছে। সে হাদিস তৈরি করত।
أبو زرعة الرازي : كان يضع الحديث وضعا
আবু যুরআ রাযী বলেন, সে বানোয়াট হাদিস রচনা করত।
أبو عبد الله الحاكم النيسابوري : يروى عن قوم من المجهولين الموضوعات، وهو ساقط
আবু আব্দুল্লাহ হাকেম নিসাবুরী বলেন, সে অজ্ঞাত ব্যাক্তিদের সুত্রে জাল হাদিস বর্ণনা করত। সে পরিত্যাজ্য।
أحمد بن شعيب النسائي : كذاب، ومرة: متروك الحديث
ইমাম নাসায়ী বলেন, সে কাজ্জাব। আরেকবার বলেন, তার হাদিস বর্জনীয়।
ابن حجر العسقلاني : معروف بالوضع
ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, হাদীস জাল করার ব্যাপারে প্রসিদ্ধ।
الدارقطني : متروك
দারাকুতনী বলেন, বর্জনীয়।
الذهبي : كذاب معروف
যাহাবী বলেন, সুপরিচিত কাজ্জাব।
محمد بن عيسى بن الطباع : قال لي: وضعت الأحاديث أرغب فيها الناس
মুহাম্মদ বিন ঈসা বিন তাব্বা’ বলেন, মায়সারা আমাকে বলেছে, আমি হাদিস বানাই মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে।
مسلمة بن القاسم الأندلسي : كذاب روى أحاديث منكرة وكان ينتحل الزهد والعبادة
মাসলামা বিন কাসেম আন্দালুসি বলেন, একটা মিথ্যুক। বহু মুনকার হাদিস বর্ণনা করেছে। যুহদ ও এবাদতগুজার হিসেবে পরিচিত ছিল।
يحيى بن معين : ليس بشيء
ইয়াহিয়া বিন মাঈন বলেন, সে কিছুই না।
আমার মনে হয় না, আমাদের আহলে হাদিস ভাইরা এত সুস্পষ্ট দলিল থাকা সত্তেও সাহাবিদের নামে কোরআনের আয়াতের এই ব্যাখ্যা পরিত্যাগ করবেন। যাক তাদের কথা। আমরা বরং শ্রেষ্ঠ মুফাসসির ইমাম আবু জাফর ইবন জারির আত তাবারীর কাছ থেকে এই আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যাটা জেনে নিই।
ইমাম তাবারী বলেন,
وأولى الأقوال التي ذكرناها في ذلك بالصواب ، القول الذي ذكرناه عن أبي بن كعب أنه عنى بذلك جميع الكفار ، وأن الإيمان الذي يوبخون على ارتدادهم عنه ، هو الإيمان الذي أقروا به يوم قيل لهم : ألست بربكم قالوا بلى شهدنا سورة الأعراف : 172
وذلك أن الله جل ثناؤه جعل جميع أهل الآخرة فريقين : أحدهما سودا وجوهه ، والآخر بيضا وجوهه . فمعلوم - إذ لم يكن هنالك إلا هذان الفريقان - أن جميع الكفار داخلون في فريق من سود وجهه ، وأن جميع المؤمنين داخلون في فريق من بيض وجهه . فلا وجه إذا لقول قائل : "عنى بقوله : " أكفرتم بعد إيمانكم " ، بعض الكفار دون بعض " ، وقد عم الله جل ثناؤه الخبر عنهم جميعهم ، وإذا دخل جميعهم في ذلك ، ثم لم يكن لجميعهم حالة آمنوا فيها ثم ارتدوا كافرين بعد إلا حالة واحدة ، كان معلوما أنها المرادة بذلك .
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় যেসব কথা উল্লিখিত হয়েছে তার মধ্যে সঠিকতর কথাটি হচ্ছে যা আমরা সাহাবি উবাই বিন কাবের সুত্রে বর্ণনা করেছি যে, আয়াতে (চেহারা অন্ধকার হয়ে যাবে বলে) সমস্ত কাফেরদের বোঝানো হয়েছে। আর ঈমান আনার পর কুফরি করার কারণে আয়াতে যে তিরস্কার করা হয়েছে, তাতে ঈমান বলে সেই দিনের কথা বলা হয়েছে যেদিন আল্লাহ বলেছিলেন “আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলল: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সাক্ষী আছি।” (সুরা আরাফ ১৭২)
এই ব্যাখ্যার যুক্তি হচ্ছে, মহান আল্লাহ সমস্ত আখিরাতবাসীদের দুটি ভাগে ভাগ করবেন, একদলের চেহারা অন্ধকার থাকবে। আরেকদলের চেহারা থাকবে উজ্জ্বল। যেহেতু জানা কথা যে, এই দুই দলের বাইরে কোন দল থাকবে না, তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, সমস্ত কাফেররা অন্ধকার চেহারার দলে অন্তর্ভূক্ত হবে। আর সকল মুমিনরা উজ্জ্বল চেহারার দলে অন্তর্ভূক্ত হবে। সুতরাং যারা আয়াতের ‘ঈমান আনার পর কুফরি কেন করলে?’ অংশের জের ধরে সকল কাফেরকে এর অন্তর্ভূক্ত না করে কেবল একটি অংশকে এর অন্তর্ভূক্ত করে তাদের বক্তব্যের পক্ষে কোন যুক্তি নেই। কারণ আয়াতে আল্লাহ সকল কাফেরের ব্যাপারে সাধারণভাবে এটি উল্লেখ করেছেন। এখন ঈমান আনার পর কুফরি করার বিষয়টি যেহেতু সকল কাফেরের ক্ষেত্রে একবার অন্তত ঘটেছে, তাই বোঝা গেল যে, এই আয়াতে ঐ বিষয়টাই বোঝানো হয়েছে।” (সমাপ্ত)
আলোচনা শেষ করা যাক, ইমাম ফখরুদ্দিন রাযির তাফসির উল্লেখ করে। কাদের চেহারা অন্ধকার হয়ে যাবে, এই সম্পর্কে তিনি মুফাসসিরদের ৫টি মত উল্লেখ করেন,
ইমাম রাযী বলেন,
الرابع: قيل هم أهل البدع والأهواء من هذه الأمة الخامس: قيل هم الخوارج، فإنه عليه الصلاة والسلام قال فيهم: " إنهم يمرقون من الدين كما يمرق السهم من الرمية " وهذان الوجهان الأخيران في غاية البعد لأنهما لا يليقان بما قبل هذه الآية، ولأنه تخصيص لغير دليل، ولأن الخروج على الإمام لا يوجب الكفر البتة.
“৪ - বলা হয়, এর অর্থ এই উম্মতের মধ্যকার আহলুল বিদআত ওয়াল হাওয়া।
৫ - বলা হয়, এর অর্থ খারেজিরা। কারণ তাদের ব্যাপারে নবিজি বলেছেন, তারা দ্বীনদের এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তীর লক্ষ্যভেদ করে বেরিয়ে যায়।
এই শেষ দুটি মত চূড়ান্তভাবে দূর্বল। কারণ এই ব্যাখ্যার সাথে আয়াতের পূর্বোক্ত কথাগুলোর কোন মিল নেই। এছাড়াও এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি ব্যাপক বিষয়কে বিনা দলিলে নির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ (খুরুজ) করা নিঃসন্দেহেই কুফর নয়।” (সমাপ্ত)

