সালাফি আকিদার বাস্তবতা
তৃতীয় শতকের আহলুল হাদিস গোষ্ঠীর আকিদাকে গোটা সালাফে সালেহিনের আকিদা বলে প্রচার
সালাফি আকিদা বলে যাদের আকিদাগত অবস্থানকে প্রমোট করা হয় তারা বাস্তবে সালাফের একটা অংশ কেবল। যাদের স্পেসিফিকলি আহলুল হাদিস বলা হতো। এই আহলুল হাদিস ক্যাম্পের উদ্ভব হয় হিজরি দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধে এবং এর প্রধান ব্যক্তিবর্গ অধিকাংশই তৃতীয় শতকের। এই আহলুল হাদিস ক্যাম্পের প্রধান ব্যাক্তি ছিলেন আহমদ বিন হাম্বল এবং তিনিই মূলত আসারি/সালাফি আকিদার প্রধান ব্যাক্তি। সালাফের যুগে আকিদাগত বৈচিত্র ও ভিন্নতা নিয়ে আরেকদিন লিখব। কিন্তু আজকের পোস্ট লেখার কারণ হলো প্রাচীন সালাফি আকিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ — আরশের ওপর আল্লাহর সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আসন গ্রহণ। আহমদ বিন হাম্বল সম্পর্কে যারা জানেন তাদের জানার কথা যে আহমদের সবচেয়ে ঘনিষ্ট সঙ্গী ছিলেন ইসহাক বিন রাহাওয়াইহ। এই দুইজন জীবনে যা কিছু করেছেন সবকিছু একসাথে করেছেন। তারা দুইজনই বিশ্বাস করতেন কেয়ামতের দিন নবীজী আল্লাহর পাশে আরশের ওপর বসবেন।
হাম্বলী মাযহাবের মূল স্থপতি হলেন আবু বকর আল-খাল্লাল। তিনিই আহমদ ও তার ছাত্রদের বক্তব্যগুলো সংকলন করে একে মাযহাবের রূপ দান করেন। অর্থাৎ হাম্বলী মাযহাবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সূত্র হলেন তিনি। এছাড়াও হাম্বলী মাযহাবের অপর গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি হলেন কাজী আবু ইয়ালা আল ফাররা। তাকে বলা হয় রুকনুল মাযহাব বা মাযহাবের ভিত্তি। আকিদা, ফিকহ ও উসুলের ক্ষেত্রে তার বক্তব্যই হাম্বলী মাযহাবের রূপরেখা এঁকে দিয়েছিল। তো আহমদ বিন হাম্বল এবং ইসহাক বিন রাহাওয়াইহের এই আকিদার কথা বর্ণনা করেছেন তারাই।
খাল্লাল এর লেখা “আস সুন্নাহ” সালাফি-আসারি আকিদার আকর গ্রন্থের একটি। তিনি এখানে লিখেছেন,
عن مجاهد، في قوله: ﴿عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا ﴾ [الإسراء: ٧٩] قال: يقعده معه على العرش. قال إسحاق بن راهويه لأبي علي القوهستاني: من رد هذا الحديث فهو جهمي.
মুজাহিদ বলেন, “হয়ত আপনার রব আপনাকে উন্নীত করবেন মাকামে মাহমুদে” [ইসরা ৭৯] আয়াতের অর্থ আল্লাহ তাকে আরশের ওপর নিজের পাশে বসাবেন। ইসহাক বিন রাহাওয়াইহ আবু আলী কুহিস্তানিকে বলেন এই হাদিস যে প্রত্যাখ্যান করে সে জাহমি।
এখন প্রশ্ন হলো মুজাহিদের মত একজন ছোট স্তরের তাবেঈর তাফসির প্রত্যাখ্যান করলে কেউ অটোমেটিক জাহমি কেন হয়ে যাবে? এর উত্তর হলো এখানে হাদিসের সনদ মূল বিবেচ্য না আহলুল হাদিসদের কাছে। যেহেতু এই হাদিসের বক্তব্য তৎকালীন আহলুল হাদিস ক্যাম্পের আকিদার সাথে মানানসই ছিল তাই এই হাদিস ছিল লিটমাস টেস্টের মত। যে এটা মেনে নিবে সে সুন্নি, যে মানবে না সে জাহমি। আর এটা আরো স্পষ্ট হয় আহমদ বিন হাম্বলের নিচের বক্তব্য থেকে।
কাযি আবু ইয়ালা ‘ইবতালুত তাবিলাত’ গ্রন্থে বলেন,
قال ابن عمير: سمعت أبا عبد اللَّه أحمد بن حنبل، وسُئل عن حديث مجاهد: يقعد محمدًا على العرش، فقال: قد تلقته العلماء بالقبول، نسلم هذا الخبر كما جاء.
ইবনে উমাইর বলেন, আমি আবু আব্দিল্লাহ আহমদ বিন হাম্বলকে বলতে শুনেছি, তাকে মুজাহিদের হাদিস “আল্লাহ মুহাম্মদকে আরশের ওপর বসাবেন” সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আলেমরা এই হাদিসকে মুতালাক্কা বিল কবুল হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আমরা এই বর্ণনাকে যেভাবে এসেছে সেভাবেই মেনে নেই।
কোন হাদিসের ক্ষেত্রে “মুতালাক্কা বিল কবুল” বলা হয় যখন সেই কেবল হাদিস সনদ নয়, মতন বা বক্তব্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করে নেওয়া হয়। আহমদ বিন হাম্বল বলছেন, তার সময়কার আহলুল হাদিস আলেমরা একে গ্রহণযোগ্য বলে কবুল করে নিয়েছেন। কারণ এটা তাদের আল্লাহর ব্যাপারে আকিদার প্রতিনিধিত্ব করে।
আল-খাল্লাল তার একই বইতে আহমদ বিন হাম্বলের নিকটতম ছাত্রদের একজন আবু দাউদের বক্তব্যও এনেছেন। আবু দাউদ বলেছেন,
من أنكر هذا فهو عندنا متهم، وقال: ما زال الناس يحدثون بهذا الحديث يريدون مغايظة الجهمية، وذلك أن الجهمية ينكرون أن على العرش شيء
এই হাদিস যে অস্বীকার করে সে আমাদের কাছে চিহ্নিত অভিযুক্ত। এই হাদিস মানুষ বর্ণনা করা কখনো বাদ দেয় নি কারণ এর মাধ্যমে তারা জাহমিয়াদের উত্তেজিত করে। কারণ জাহমিয়াদের বিশ্বাস হলো আরশের ওপর কিছু নেই।
আহলুল হাদিসদের জন্য এই হাদিসে বিশ্বাস কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে আবু দাউদের ছাত্র আহমদ বিন সালমান আন নাজ্জাদের এই বক্তব্যে। নাজ্জাদ ছিলেন আহমদ বিন হাম্বলের ছাত্রদের ছাত্র। ইবনে আবি ইয়ালা "তাবাকাতুল হানাবিলা"তে বলেন,
قال النجاد: وعلى ذلك من أدركت من شيوخنا أصحاب أبى عبد الله أحمد بن محمد بن حنبل. فإنهم منكرون على من رد هذه الفضيلة. ولقد بين الله ذلك على ألسنة أهل العلم على تقادم الأيام. فتلقاه الناس بالقبول. فلا أحد ينكر ذلك ولا ينازع فيه
নাজ্জাদ বলেন, এই বিশ্বাসের ওপরই আমি আমার শায়খদের পেয়েছি যারা ছিলেন আবু আব্দিল্লাহ আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন হাম্বলের সঙ্গী। যারা নবীর এই ফযিলত অস্বীকার করত তাদের ওপর আপত্তি করতেন। আল্লাহ এর আলোচনা আহলে ইলমদের জবানে সময়ের পরিক্রমায় জারি রেখেছেন। মানুষজন একে কবুল বলে গ্রহণ করে নিয়েছে। একে অস্বীকার করে কিংবা এই নিয়ে বিতর্ক করে এমন কেউই নেই।"
قال النجاد: فبذلك أقول. ولو أن حالفا حلف بالطلاق ثلاثا: أن الله يقعد محمدا ﷺ معه على العرش، واستفتانى فى يمينه، لقلت له: صدقت فى قولك، وبررت فى يمينك، وامرأتك على حالها. فهذا مذهبنا وديننا واعتقادنا وعليه نشأنا. ونحن عليه إلى أن نموت إن شاء الله. فلزمنا الإنكار على من رد هذه الفضيلة التى قالها العلماء وتلقوها بالقبول. فمن ردها فهو من الفرق الهالكة
নাজ্জাদ বলেন, “আমিও একই কথা বলি। কোন ব্যাক্তি যদি এই কথার ওপর তিন তালাকের শপথ করে বলে, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহাম্মদকে তাঁর পাশে আরশে বসাবেন এবং আমাকে এর ব্যাপারে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে আমি বলব, তুমি তোমার কথায় সত্যবাদী, তোমার শপথ পূর্ণ হয়েছে, ফলে তোমার স্ত্রীর আগের অবস্থাতেই আছে।
এটাই আমাদের মাযহাব। এটাই আমাদের ধর্ম ও বিশ্বাস। আর এর ওপরই আমরা প্রতিপালিত হয়েছি। আর আমরা একে মৃত্যু পর্যন্ত আঁকড়ে থাকব ইনশাআল্লাহ। সুতরাং যারা এই ফযিলত অস্বীকার করবে যা আলেমরা বর্ণনা করেছেন এবং কবুল বলে মেনে নিয়েছেন, তার ওপর আপত্তি জানানো আমাদের কর্তব্য। যে একে অস্বীকার করবে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত ফেরকার অন্তর্ভূক্ত।"
সালাফি আকিদার অন্য আরেক আকর গ্রন্থ হলো আল আজুররির লেখা "আশ শরিয়াহ"। প্রত্যেক শিক্ষিত সালাফি এই বইয়ের নাম জানে। আজুররি তার বইতে বলেন,
وأما حديث مُجاهد .. فقد تلقّاه الشُّيوخ من أهل العلم والنَّقل لحديث رسول الله -صلى الله عليه وسلم- تلَقّوها بأحسن تلقٍّ، وقبلوها بأحسن قبول، ولم يُنكروها، وأنكروا على من ردَّ حديث مُجاهدٍ إنكارًا شديدًا، وقالوا: من ردَّ حديث مجاهد فهو رجلُ سُوء
মুজাহিদের এই হাদিস আল্লাহর রাসূলের হাদিস বর্ণনায় নিযুক্ত শায়খগণ বরণ করে নিয়েছেন। তারা একে অতি উত্তমরূপে গ্রহণ করেছেন এবং সুন্দরতম উপায়ে কবুল করেছেন। তারা একে অস্বীকার করেন নি। বরং যারা মুজাহিদের এই হাদিস অস্বীকার করে তাদের ব্যাপারে কঠোর আপত্তি করেছেন এবং বলেছেন, এই হাদিসকে যারা প্রত্যাখ্যান করে তারা নিকৃষ্ট ব্যাক্তি।
নব্য-সালাফিদের অনেককে দেখা যায় এই হাদিসের ক্ষেত্রে তারা তাদের সালাফদের অনুসরণ পরিত্যাগ করেছে। অথচ সালাফিদের প্রধানতম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন,
كان السَّلف والأئمة يروونه ولا يُنكرونه، ويتلَقّونه بالقبول
সালাফ ও ইমামগণ এই হাদিসকে বর্ণনা করতেন, এর ব্যাপারে আপত্তি করতেন না এবং একে তারা কবুল বলে গ্রহণ করে নিয়েছেন।
মুজাহিদের এই হাদিসটা সালাফি আকিদার উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে গবেষকদের জন্য খুবই গুরত্বপূর্ণ। কীভাবে তৃতীয় শতকের ছোট্ট একটি দলের বক্তব্যকে গোটা সালাফে সালেহীনের মত বলে চালিয়ে দেওয়া হয় তা আমরা ইবনে তাইমিয়্যাহর এই বক্তব্যে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। আর এটাই মূলত সালাফি আকিদার বাস্তবতা।

