হযরত উসমানের হত্যাকাণ্ডে আমিরে মুয়াবিয়ার সংশ্লিষ্টতা
মৃত্যুর পূর্বে মুয়াবিয়ার চক্রান্ত সম্পর্কে হযরত উসমানের স্পষ্ট বক্তব্য
মুসলিমদের মাঝে বিভেদ ও অনৈক্যের সূচনা হয় যুন্নুরাইন হযরত উসমান বিন আফফানের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এরই জের ধরে সংঘটিত হয় মুসলিমদের মাঝে প্রথম রক্তক্ষয় যা ইতিহাসে জঙ্গে জামাল বলে পরিচিত। এই গৃহযুদ্ধে ইমাম আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওসিয়ত অনুযায়ী নাকেসিন জামাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এই জামাতে ছিলেন মুখলিস সাহাবাগণ—তালহা, যুবায়ের, আয়েশা। আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। তারা নিজেদের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হন এবং অবশেষে বুঝতে পারেন তারা চক্রান্তের ফাঁদে পা দিয়েছেন। কিন্তু কে বা কারা এই ফাঁদ পেতেছিল অন্যায়ভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে? সেটা আমরা ইমাম আলীর দ্বিতীয় জিহাদ, যা তিনি নবীর ওসিয়ত মোতাবেক কাসেতিন তথা ফেরকায়ে বাগিয়া—আহলুশ শামের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। হ্যাঁ, এই চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র ছিল অভিশপ্ত বনু উমাইয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আমিরে মুয়াবিয়ার নীল নকশা। হযরত উসমানকে হত্যা করার মাধ্যমে ফিৎনা ও অরাজকতা সৃষ্টি করে chaos is a ladder তরিকায় ক্ষমতা দখল করেন "লিটলফিঙ্গার" মুয়াবিয়া। এই বিষয়ে অসংখ্য তথ্য প্রমাণ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইতিহাসের বইতে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত। আমরা আজ এই মর্মে ইমাম ইবনে সা‘দের লেখা "আত তাবাকাতুল কুবরা" বই থেকে প্রমাণ দিচ্ছি যাতে আপনারা দেখবেন যে হযরত উসমান নিজের হত্যার জন্য আমিরে মুয়াবিয়াকে দায়ী করে গিয়েছেন। এই বর্ণনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মৃত্যুর পূর্বে নিহত ব্যক্তির জবানী সবচাইতে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচ্য হয়ে থাকে। চলুন দেখে নিই এই বর্ণনা, যা চারটি শক্তিশালী সনদে ইমাম ইবনে সা‘দ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন।
ইবনে সাদ বলেন, (প্রথম সনদ) আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু ওমর বলেছেন, তিনি বলেছেন, আমাকে শারহাবীল ইবনু আবী আউন তাঁর পিতার সূত্রে বলেছেন।
(দ্বিতীয় সনদ) ইবনে সাদ বলেন, আব্দুল হামিদ ইবনু ইমরান ইবনু আবী আনাস আমাকে বলেছেন, তিনি তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি আল-মিসওয়ার ইবন মাখরামার সূত্রে।
(তৃতীয় সনদ) মূসা বিন ইয়াকূব আমাদেরকে বলেছেন, তার চাচার সূত্রে, ইবনুজ জুবায়ের থেকে।
(চতুর্থ সনদ) ইবনু আবী হাবীবা আমাদেরকে দাউদ ইবনুল হুসাইনের সূত্রে, ইকরিমার সূত্রে, ইবনু আব্বাসের সূত্রে বলেছেন।
তারা সবাই (আবু আওন, মিসওয়ার ইবন মাখরামা, ইবনুজ জুবায়ের, ইবনু আব্বাস) বলেন:
بعث عثمان بن عفان بالمسور بن مخرمة إلى معاوية يعلمه أنه محصور، ويأمره أن يبعث إليه جيشا سريعا يمنعونه، فلما قدم على معاوية وأبلغه ذلك، ركب معاوية نجائبه ومعه معاوية بن حديج، ومسلم بن عقبة، فسار من دمشق إلى عثمان عشرا، فدخل المدينة نصف الليل، فدق باب عثمان فدخل فأكب عليه فقبل رأسه،
"উসমান বিন আফফান মিসওয়ার বিন মাখরামাকে মুয়াবিয়ার কাছে পাঠিয়েছিলেন এটা জানাতে যে, তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং মুয়াবিয়াকে যেন আদেশ জানিয়ে দেন যাতে সে দ্রুত একটি সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে যারা তাকে রক্ষা করবে। তিনি মুয়াবিয়ার কাছে এসে তাকে বিষয়টি অবহিত করলে, মুয়াবিয়া তার দূতদের সাথে রওয়ানা হন। এই দলে ছিলেন মুয়াবিয়া বিন হুদায়জ ও মুসলিম বিন উকবা। তারা দামেস্ক থেকে উসমানের উদ্দেশ্যে মদিনায় আসেন। তারা মধ্যরাতে মদিনায় প্রবেশ করে। মুয়াবিয়া উসমানের দরজায় টোকা দেয়, ভেতরে প্রবেশ করলেন, কুজো হয়ে উসমানের মাথায় চুমু দেয়।"
فقال عثمان: فأين الجيش؟ فقال معاوية: لا والله ما جئتك إلا في ثلاثة رهط، فقال عثمان: لا وصل الله رحمك، ولا أعز نصرك ولا جزاك عنى خيرا، فوالله ما أقتل إلا فيك ولا ينقم على إلا من أجلك .
"উসমান জিজ্ঞেস করলেন: সেনাবাহিনী কোথায়? মুয়াবিয়া বললেন: "না, আল্লাহর কসম, আমি কেবল তিনজন নিয়ে এসেছি।" উসমান বললেন: "আল্লাহ তোমার আত্মীয়তা নষ্ট করুক। তোমার সহযোগিতা কোনদিন সফল না করুক। আমার পক্ষ থেকে কোন উত্তম বদলা না দিক। আল্লাহর কসম! আমাকে যদি হত্যা করা হয় কেবল তোমার মাধ্যমে হবে। আমার ওপর যদি প্রতিশোধ নেওয়া হয় কেবল তোমার কারণে করা হবে।"
মুয়াবিয়া বলল,
فقال معاوية: بأبي أنت وأمى إنى لو بعثت إليك جيشا فسمعوا به عاجلوك فقتلوك قبل أن يبلغ الجيش إليك، ولكن معى نجائب لا تساير، ولم يشعر بى أحد، فاخرج معى، فوالله ما هى إلا ثلاث ليال حتى ترى معالم الشام، فإنها أكثر الإسلام رجالا، وأحسنه فيك رأيا،
"আমার বাবা মা আপনার তরে ফিদা হোক। আমি সৈন্যবাহিনী পাঠালে তারা পৌঁছার আগেই বিদ্রোহীরা আওয়াজ শুনে দ্রুত আপনাকে হত্যা করে ফেলত। আমার সাথে আমার নিজের লোকজন আছে, তারা বিক্ষিপ্ত হবে না। ফলে কেউই টের পাবে না। আপনি কেবল তিন রাতের জন্য আমাদের সাথে সফর করুন। এরপরই আপনি শামের দিগন্ত দেখতে পাবেন। শামবাসী মুসলিমদের মাঝে সংখ্যাগরিষ্ঠ, আপনার ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও অন্যদের চাইতে ভালো।"
فقال عثمان: بئس ما أشرت به، وأبى أن يجيبه إلى ذلك.
উসমান বললেন, "কত নিকৃষ্ট তোমার এই প্রস্তাব। তিনি মুয়াবিয়ার কথা শুনতে অস্বীকার করেন।"
فخرج معاوية إلى الشام راجعا، وقدم المسور يريد المدينة، فلقى معاوية بذى المروة راجعا إلى الشام، فقدم المسور على عثمان وهو ذام لمعاوية غير عاذر له. فلما كان في حصره الآخر بعث المسور أيضا إلى معاوية فأغذ السير حتى قدم عليه فقال: إن عثمان بعثنى إليك لتبعث إليه الرجال والخيول، وتنصره بالحق وتمنعه من الظلم. فقال: إن عثمان أحسن فأحسن الله به، ثم غير فغير الله به، فشددت عليه
ফলে মুয়াবিয়া শামের পথে ফেরত রওনা দেয়, আর এদিকে মিসওয়ার মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রাপথে জিল মুরুয়াতে মুয়াবিয়ার সাথে সাক্ষাৎ হয়। মিসওয়ার মদিনায় উসমানের কাছে ফিরে মুয়াবিয়ার নিন্দা করতে থাকেন এবং তাকে কোন ওজর বা ছাড় দেন না। অবরোধের শেষ পর্যায়ে উসমান মিসওয়ারকে আবার মূয়াবিয়ার কাছে পাঠান। তিনি তার কাছে পৌঁছে বলেন, "উসমান আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন যাতে তুমি পদাতিক ও অশ্ববাহিনী পাঠিয়ে বিদ্রোহীদের জুলুম থেকে তাকে রক্ষা করতে পার।" মিসওয়ার বলেন, "উসমান যখন কল্যাণ করেছেন আল্লাহও তার কল্যাণ করেছেন। তিনি যখন বদলে যান আল্লাহও তার পরিস্থিতি বদলে দেন। তাই আমি তার প্রতি কঠোর হয়েছি।"
فقال: يا مسور، تركتم عثمان حتى إذا كانت نفسه في حنجرته، قلتم: اذهب فادفع عنه الموت، وليس ذلك بيدى، ثم أنزلنى في مشربة على رأسه، فما دخل علي داخل حتى قتل عثمان رحمة الله عليه ورضوانه.
"মুয়াবিয়া বলে, হে মিসওয়ার তোমরা উসমানকে এমনভাবে পরিত্যাগ করেছ যে তার গলার ওপর ছুরি। আর এখন তোমরা বলছ তাকে হত্যা থেকে বাঁচাও! আল্লাহর কসম এটা আমার হাতে নাই। মিসওয়ার বলেন, "সে আমাকে কাছের এক জলাশয়ে নামিয়ে দেন। আর এমন সময়ে আমার কাছে কাছে কেউ আসার আগেই উসমান নিহত হয়ে যান। আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি তার ওপর বর্ষিত হোক।"
قال: أخبرنا محمد بن عمر، قال: حدثنى عبد الله بن جعفر، عن أم بكر بنت المسور، عن أبيها، قال: قال لى معاوية: يا مسور، أنت ممن قتل عثمان، فقال المسور: أنا والله يا معاوية نصحته واعتزلته، وأنت غششته وخذلته، فإن شئت أخبرت القوم خبرك وخبرى حين قدمت عليك الشام، فقال معاوية: لا يا أبا عبد الرحمن.
ইবনে সাদ বলেন, আমাদের মুহাম্মদ বিন ওমর বলেছেন, তিনি বলেন, আমাদের আবদুল্লাহ বিন জাফর বলেছেন, মিসওয়ার (রা.) এর কন্যা উম্মে বকর থেকে, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, মুয়াবিয়া আমাকে বলল তুমি তো উসমানের হত্যাকারীদের একজন। মিসওয়ার বলেন, আল্লাহর কসম, আমি তাকে নসীহত করেছি এবং সরে গিয়েছি। কিন্তু তুমি তার সাথে ধোঁকাবাজি করেছ এবং অপদস্থ করেছ। তুমি চাইলে আমি শামদেশে প্রবেশ করে সবাইকে তোমার ও আমার এই খবর প্রকাশ করে দিব। মুয়াবিয়া বলে, এমনটি করবেন না, হে আবু আব্দুর রহমান।"

